সংকটে উন্নয়নশীল বিশ্ব, সমাধানহীন আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক বৈঠক
এইসময় অনলাইন ডেস্ক:
বিশ্ব অর্থনীতিতে যুদ্ধ, ঋণের বোঝা, মূল্যস্ফীতি, বৈষম্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাব নিয়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তা। এসব সংকটের চাপে কঠিন সময় পার করছে উন্নয়নশীল দেশগুলো। সংকট উত্তরণে দিকনির্দেশনা খুঁজতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক বৈঠকে বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারকেরা অংশ নিলেও সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত সমাধান ছাড়াই শেষ হয়েছে আলোচনা।
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত সপ্তাহে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত বৈঠকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণসংকট, অর্থনৈতিক বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও এআইয়ের প্রভাব মোকাবিলায় বড় কোনো নতুন উদ্যোগ ঘোষণা করা হয়নি। বরং বাজেট ঘাটতি কমানো, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সংস্কার এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর মতো প্রচলিত পরামর্শই গুরুত্ব পেয়েছে।
আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোও বর্তমানে বাজেটের ভারসাম্য রক্ষায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এসব দেশে বন্ডের মুনাফার হার ও ঋণ নেওয়ার ব্যয় বাড়ায় তার প্রভাব পড়ছে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপরও। ফলে অনেক দেশ নিজেদের ঋণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেও আগের তুলনায় বেশি সুদ পরিশোধ করতে বাধ্য হচ্ছে।
রাজস্বের বড় অংশ যাচ্ছে ঋণ পরিশোধে
জর্জিয়েভার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণ পরিশোধের গড় ব্যয় এক দশক আগের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি বেড়ে সরকারি রাজস্বের প্রায় ১৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধে বিপুল অর্থ ব্যয় হওয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক খাতে ব্যয়ের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।
বৈশ্বিক অর্থনীতির সংকট মোকাবিলায় এখনো স্পষ্ট সমাধান পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে জর্জিয়েভা সতর্ক করেন। একই সঙ্গে সব সমস্যার সমাধান জানা আছে বলে দাবি করা ব্যক্তিদের বক্তব্য অন্ধভাবে বিশ্বাস না করার পরামর্শ দেন তিনি।
অ্যাটলান্টিক কাউন্সিলের আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট জশ লিপস্কির মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও দিকনির্দেশনা দেওয়ার সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি বৈঠকটি। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো নিজেরাই যখন আর্থিক ঝুঁকিতে রয়েছে, তখন দরিদ্র দেশগুলোর উন্নয়ন সহায়তা অগ্রাধিকার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
এআইয়ের সম্ভাবনা থাকলেও পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি উদ্বেগও তৈরি করেছে। এআই উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারে। তবে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও দক্ষ জনবলের অভাবে দরিদ্র দেশগুলো এই প্রযুক্তির সুফল থেকে পিছিয়ে পড়তে পারে। এ ছাড়া কর্মসংস্থান ও আয়বৈষম্যের ওপর এআইয়ের প্রভাব নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের উপপ্রধান অর্থনীতিবিদ আয়হান কোসে বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের জ্বালানিসংকট সামাল দিতে সক্ষম হলেও উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় ধরনের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দুর্বল হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস প্রায় ৪ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ৩ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে।
এআইয়ের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের তুলনায় উন্নয়ন প্রকল্পে বেসরকারি পুঁজির প্রবাহ তিন গুণের বেশি বেড়েছে। তবে সরকারি উন্নয়ন সহায়তা কমে যাওয়া এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নানা প্রতিবন্ধকতা থাকায় দরিদ্র দেশগুলোর চ্যালেঞ্জ কাটছে না।
বৈষম্য ও জলবায়ু সংকটেও কার্যকর রূপরেখার অভাব
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও কলম্বিয়ার সাবেক অর্থমন্ত্রী মাউরিসিও কার্দেনাসের মতে, ভবিষ্যতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আশঙ্কা রয়েছে। তবে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় কীভাবে এগোতে হবে, সে বিষয়ে কার্যকর পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে।
ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কেট পিকেট অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তাঁর মতে, বৈষম্য বৃদ্ধি ও দারিদ্র্যের বিস্তার দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। শুধু সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা অর্জন করলেই চলবে না, অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোও নিশ্চিত করতে হবে।
বৈঠকের সময় থাইল্যান্ডের বন্যাও জলবায়ুজনিত ঝুঁকির বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে। সেপ্টেম্বরে বন্যায় দেশটির শিল্প খাতে প্রায় ২০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে যুদ্ধ, ঋণের বাড়তি চাপ, মূল্যস্ফীতি, বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতির কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। এসব চ্যালেঞ্জ নিয়ে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈঠকে আলোচনা হলেও সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত সমাধানের অভাবে সংকট উত্তরণের পথ এখনো স্পষ্ট নয়।
সূত্র: রয়টার্স।

