আজকের সময়ের সেরা খবর
বিশ্বনাথে ‘বিলাতের বৃষ্টি’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন

বিশ্বনাথ প্রতিনিধি:

বহুল প্রতীক্ষিত গ্রন্থ ‘বিলাতের বৃষ্টি’ অনাড়ম্বর ও বর্ণিল অনুষ্ঠানের মাধ‌্যমে এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২০ নভেম্বর) রাতে বিশ্বনাথ পৌর শহরের পুরাণবাজার এলাকায় প্রেসক্লাব কার্যালয়ে আয়োজন করা হয় মনোজ্ঞ প্রকাশনা উৎসব।

মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে নানা শ্রেণি–পেশার সাহিত্যপ্রেমী, গবেষক, লেখক, শিক্ষাবিদ ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। গ্রন্থটি রচনা করেছেন প্রবাসী লেখক ও গবেষক সিলেটের বিশ্বনাথ প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও লন্ডন-বাংলা প্রেসক্লাবের সাবেক সহ-সভাপতি কবি মোঃ রহমত আলী। যিনি দীর্ঘদিন ধরে বিলাতের সমাজ, সংস্কৃতি ও প্রবাসজীবনের বাস্তবতা নিয়ে লেখালেখি করছেন।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক সিলেট জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ওসমানীনগর সার্কেল) মোঃ আশরাফুজ্জামান পিপিএম-সেবা। তিনি বলেন, “আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ, প্রবাস জীবনের সংগ্রাম এবং আগামীর সম্ভাবনাকে অত্যন্ত সুন্দর, মার্জিত ও বাস্তবধর্মী লেখনীতে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। ‘বিলাতের বৃষ্টি’ কেবল একটি গ্রন্থ নয়, এটি প্রবাসী জীবনের জীবন্ত দলিল।” বইটির ভাষা ও উপস্থাপনাকে তিনি সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করার মতো বলেও মন্তব্য করেন।

গ্রন্থের লেখক কবি মোঃ রহমত আলী বলেন, দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ও অনুভূতির বাস্তব রূপ হলো ‘বিলাতের বৃষ্টি’। বইটির প্রতিটি লেখায় চেষ্টা করেছি প্রবাসজীবনের আনন্দ–দুঃখ, সংগ্রাম–সাফল্য এবং স্মৃতি-বেদনার বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে। এসময় তিনি বলেন,মৃত্যুর পরও মানুষের মাঝে বেঁচে থাকার মতো কিছু রেখে যেতে চাই। এসময় তিনি পাঠকদের ভালোবাসা ও সমর্থন কামনা করেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশ্বনাথ প্রেসক্লাবের সভাপতি রফিকুল ইসলাম জুবায়ের এবং সঞ্চালনা করেন তরুণ উপস্থাপিকা সুইটি আক্তার রুনা। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন বিশ্বনাথ থানার অফিসার ইন-চার্জ (ওসি) এনামুল হক চৌধুরী, বিশ্বনাথ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী দয়াল উদ্দিন তালুকদার, বাংলাদেশ পয়েন্টস ক্লাবের সভাপতি কবি মুস্তাফিজুর রহমান, বিশ্বনাথ মডেল প্রেসক্লাবের আহবায়ক জাহাঙ্গীর আলম খায়ের, সাবেক সভাপতি আশিক আলী ও সাবেক দপ্তর সম্পাদক সালেহ আহমদ সাকী।

জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিশ্বনাথ প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি তজম্মুল আলী রাজু। লেখকের জীবনী পাঠ করেন কবি জুবের আহমদ সার্জন। অনুষ্ঠানে এলাকার সাংবাদিক, লেখক, সংগঠকসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

ধ্বংসের মুখে হাছন রাজার বাড়ি, পুনর্গঠনে উদ্যোগ নিয়েছেন উত্তরাধিকারীরা

সালেহ আহমদ সাকী
‘লোকে বলে, বলেরে ঘর-বাড়ি ভালা না আমার, জানতো যদি হাছন রাজা বাঁচব কতদিন, বানাইতো দালান-কোঠা করিয়া রঙিন।’
মরমি কবি হাছন রাজার এই অমর পঙ্ক্তি যেন আজ বাস্তব হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁরই জন্মভিটায়। সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার রামপাশা গ্রামের ঐতিহ্যবাহী সেই বাড়িটি আজো রয়েছে জরাজীর্ণ ও ভগ্নদশায়।
বিলুপ্তির পথে হাছন রাজার শতবর্ষ পুরনো এই বাড়ি এখনো টানে হাজারো পর্যটককে। কিন্তু ধ্বংসপ্রায় অবস্থায় থাকা বাড়িটি দেখে হতাশ হয়ে ফিরে যান অনেকে। তবে এবার আশার আলো দেখাচ্ছেন হাছন রাজা লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদ । তারা আগামী ২০ ও ২১ ডিসেম্বর এক অনাড়ম্বর আয়োজনে ‘হাছন উৎসব’ সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পালনের উদ্যোগ নিয়েছেন।

এব্যপারে হাছন রাজার উত্তরাধিকারী, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান দেওয়ান শমশের রাজা চৌধুরীও
হাছন রাজার বাড়িটি সংস্কার করে লাইব্রেরি, মিউজিয়াম ও সুফিবাদ দর্শনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছেন। এতে হাছন রাজার দর্শন, জীবনবোধ ও লোকসংগীতচর্চা নতুন প্রজন্মের কাছে আরও গভীরভাবে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।


১৮৫৪ সালের ২১ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জের তেঘরিয়া গ্রামে এক জমিদার পরিবারে জন্ম নেন মরমি কবি হাছন রাজা। ১৮৬৯ সালে তার পিতা আলী রাজার মৃত্যুর চল্লিশ দিন পর তার বড় ভাই ওবায়দুর রেজা মারা যান। পিতা ও ভাইয়ের জমিদারিস্থল রামপাশায় মাত্র ১৫ বছর বয়সেই হাছন জমিদারিতে অভিষিক্ত হয়েছিলেন। অপরিপক্ব বয়সে লক্ষনশ্রী ও রামপাশার বিশাল জমিদারির একক আধিপত্য পেয়ে হাছন রাজা বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন। যৌবনে তিনি ছিলেন ভোগ-বিলাসী এক শৌখিন জমিদার। বর্ষায় বজরা নৌকা সাজিয়ে গান-বাজনায় ঘুরে বেড়াতেন। বিলাসী জীবনের মাঝে আধ্যাত্মিক বোধের জন্ম নেয় তার মনে। জমিদারির বিলাসী পোশাক ছেড়ে নেন সাধারণ পোশাক। তিনি জমিদার থেকে হয়ে ওঠেন এক সুফি সাধক । বাউল জীবন বেছে নিয়ে একের পর এক গান রচনা করতে থাকেন। তাঁর গান আজও বাঙালির হৃদয়ে অনুরণিত।
সরেজমিন দেখা যায়, রামপাশার ঐতিহাসিক বাড়িটিতে এখন ধ্বংসাবশেষ ছাড়া তেমন কিছুই অবশিষ্ট নেই। আগাছায় ঢাকা জায়গায় রয়েছে দুটি জরাজীর্ণ কক্ষ, একটি ছাদবিহীন ঘর ও লতাগুল্মে ঘেরা ভাঙা দেয়াল। রয়েছে জমিদার আমলের বিশাল দীঘি ও রাজপরিবারের পুরনো কবরস্থান।
বছরজুড়ে দেশ-বিদেশ থেকে হাছন অনুরাগীরা বাড়িটি দেখতে এলেও, সংরক্ষণের অভাবে সেটি ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ হাছন রাজার শেষ স্মৃতিচিহ্নটি রক্ষায় কার্যকর কোনো সরকারি উদ্যোগ কখনো নেওয়া হয়নি।

হাছন রাজা লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি, রেটিনা বিশেষজ্ঞ ডা. মো. জহিরুল ইসলাম অচিনপুরী বলেন, “হাছন রাজার সুফিবাদ ও মরমি দর্শন, সৃষ্টিকর্তা ও পরকালকেন্দ্রীক দর্শনকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে আমরা আয়োজন করছি হাছন স্মরণোৎসব। এটি হবে বাঙালি লোকসংস্কৃতির এক নবজাগরণের উৎসব।”
এব্যপারে হাছন রাজা লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সোলেমান হোসেন চুন্নু বলেন “হাছন রাজার গান, ভাবনা ও দার্শনিক চেতনা গবেষণা, চর্চা ও প্রকাশে সরকার ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। গ্রামীণ সাংস্কৃতিক মঞ্চগুলোতে হাছনের গান নিয়মিত পরিবেশিত হোক, যাতে নতুন প্রজন্ম নিজের শিকড়কে চিনতে পারে।”

বিশ্বনাথ থিয়েটারের সভাপতি ও চাউলধনী স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক আনহার আলী বলেন, “লোকসংগীতের মূল সূর, হাছনের ভাব ও তাঁর সহজ সরল জীবনের দর্শন নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। হাছন উৎসব কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, এটি সংস্কৃতি জাগরণের প্রতীক হয়ে উঠবে।”


যে কবি নিজেই বলেছিলেন, ‘ঘরবাড়ি ভালা না আমার’, শত বছর পর তাঁর সেই কথাই যেন বাস্তবে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। তবে উত্তরসূরি ও সংস্কৃতিকর্মীদের উদ্যোগে যদি এবার সংস্কারের কাজ সফল হয়, তবে হয়তো আবারও রামপাশা গ্রাম ভরে উঠবে হাছনের গানে, দর্শনে ও লোকসংস্কৃতির আলোয়।