এইসময় ডেস্ক:
‘এবার ভোট গণনায় দেরি হতে পারে’—এ ধরনের বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ইদানীং একটি নতুন গল্প শোনা যাচ্ছে। বলা হচ্ছে, এবার নাকি ভোট গণনায় অনেক বেশি সময় লাগবে। এই গল্প জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করার একটি অপচেষ্টা।
সোমবার যশোরে প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক সফরে এসে এক নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। তারেক রহমান বলেন, এ দেশের মানুষ গত এক যুগ ধরে ভোট দিতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা তাদের নেই—এ কথা ঠিক নয়। ১৯৯১ সালে মানুষ ভোট দিয়েছে, ১৯৯৬ সালে ভোট দিয়েছে, ২০০১ সালেও ভোট দিয়েছে। ভোট গণনায় কত সময় লাগে, তা বাংলাদেশের মানুষ খুব ভালোভাবেই জানে।
তিনি বলেন, যদি কেউ ভোট গণনায় দেরির অজুহাত তুলে কোনো ধরনের সুযোগ নিতে চায়, তাহলে জনগণকেই সেই অপচেষ্টার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। ভোটের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব শুধু রাজনৈতিক দলের নয়, এই দায়িত্ব দেশের প্রতিটি নাগরিকের।
যশোর জেলা বিএনপির উদ্যোগে দুপুরে উপশহর কলেজ মাঠে এই জনসভার আয়োজন করা হয়। সকাল থেকেই জনসভাস্থল, পাশের ঈদগাহ মাঠ, বাদশা ফয়সল স্কুল মাঠ ও আশপাশের সড়কগুলো বিএনপির নেতাকর্মী, সমর্থক এবং সাধারণ মানুষের ভিড়ে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। খুলনার নির্বাচনী জনসভায় ভাষণ শেষে তারেক রহমান হেলিকপ্টারে দুপুর ২টা ১৮ মিনিটে যশোরের উপশহর কলেজ মাঠের পাশে অবতরণ করেন। বেলা আড়াইটার দিকে মঞ্চে ওঠেন তিনি এবং ২টা ৩৭ মিনিটে বক্তব্য শুরু করে প্রায় ৪০ মিনিট ধরে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন।
এক ঘণ্টার এই সংক্ষিপ্ত যশোর সফরের শেষাংশে তারেক রহমান যশোর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের সাত জেলা—যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, নড়াইল, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গার বিএনপি মনোনীত ২২ জন প্রার্থীর হাতে ধানের শীষ প্রতীক তুলে দেন। একই সঙ্গে তিনি উপস্থিত জনতার প্রতি আহ্বান জানান, এসব প্রার্থীকে বিপুল ভোটে জয়যুক্ত করে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে।
কোনো দলের নাম উল্লেখ না করে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, একটি পক্ষ এখন তাদের লোকজনকে মা-বোনদের কাছে পাঠাচ্ছে জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহের জন্য। তারা দাবি করছে, নাকি তারা সৎ লোকের শাসন কায়েম করবে। অথচ মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের মতো অসৎ প্রস্তাব দিয়েই যদি কাজ শুরু হয়, তাহলে কীভাবে তারা সৎ শাসনের কথা বলে—সেটাই বড় প্রশ্ন।
তিনি আরও বলেন, জনগণের সামনে দাঁড়িয়ে তারা মিথ্যা দাবি করেছে যে তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছিল। অথচ বিশেষজ্ঞরা প্রমাণ করেছেন, সেই অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়নি। শুধু নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্য তারা এখন একের পর এক মিথ্যা কথা বলছে। যারা নির্বাচনের আগেই জনগণের সঙ্গে মিথ্যা বলতে পারে, তারা নির্বাচনের পর কী করবে, তা সহজেই অনুমেয়।
তারেক রহমান বলেন, আজকে একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে নির্বাচনকে বিতর্কিত ও বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে তিনি দেশের সর্বস্তরের মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান, যাতে কোনো ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আবারও জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া না যায়।
বক্তব্যে দেশ পুনর্গঠনে নিজের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরার পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়ন নিয়েও নানা প্রতিশ্রুতি দেন বিএনপি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, জনগণের ভোটে সরকার গঠন করতে পারলে যশোরের ফুল আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া হবে। এতে এই অঞ্চলের কৃষক ও ব্যবসায়ীরা সরাসরি লাভবান হবেন। একই সঙ্গে তিনি আখ চাষের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, বন্ধ হয়ে যাওয়া চিনিকলগুলো আবার সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্মৃতিচারণ করে তারেক রহমান বলেন, যশোরের উলাসী খাল খননের উদ্বোধন করেছিলেন জিয়াউর রহমান নিজেই। বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে তিনি নিজেও খাল কাটতে যশোরে আসবেন বলে ঘোষণা দেন এবং সেই কাজে সকলকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান। এছাড়া যশোর-কুষ্টিয়া অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জিকে প্রকল্প আবারও সচল করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
নারী সমাজ নিয়ে কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের বক্তব্যের সমালোচনা করে তারেক রহমান বলেন, একটি রাজনৈতিক দল দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীদের কীভাবে ঘরের মধ্যে আটকে রাখা যায়, সে ধরনের চিন্তাভাবনার কথা বলছে। সম্প্রতি সেই দলের এক নেতা কর্মজীবী মা-বোনদের সম্পর্কে যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, তা শুধু অশালীনই নয়, কলঙ্কজনকও।
তিনি হযরত বিবি খাদিজা (রা.)-এর উদাহরণ টেনে বলেন, হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর সহধর্মিণী হযরত খাদিজা (রা.) ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। ইসলামের ইতিহাসেই নারীর কর্মজীবনের এই দৃষ্টান্ত রয়েছে। তাই কর্মজীবী নারীদের অপমান করার কোনো অধিকার কারও নেই।
তারেক রহমান বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আমরা ধরে নিয়েছিলাম, দেশের রাজনীতিতে একটি গুণগত পরিবর্তন এসেছে। আশা করেছিলাম, রাজনীতিতে শালীনতা ও জনগণের মর্যাদা রক্ষার ধারা প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, একটি রাজনৈতিক দল আবারও মা-বোনদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথা বলা শুরু করেছে এবং তাদের ঘরের ভেতর আটকে রাখার চিন্তা সামনে আনছে।
তিনি বলেন, বিএনপি বিশ্বাস করে দেশ পুনর্গঠন ও এগিয়ে নিতে নারী-পুরুষ সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে। জনগণের ভোটে বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড এবং কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড চালু করা হবে। এসব কার্ডের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সহায়তা আরও সহজ হবে।
এছাড়া দেশের বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত বেকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিএনপির বিভিন্ন পরিকল্পনার কথাও তিনি বক্তব্যে তুলে ধরেন।
যশোর জেলা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ সাবেরুল হক সাবুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই জনসভায় আরও বক্তব্য রাখেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক নার্গিস বেগম, খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিতসহ যশোর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।