আজকের সময়ের সেরা খবর
বিশ্বনাথের গোয়াহরী গ্রামে বার্ষিক পলো বাওয়া উৎসব
Spread the love

নিজস্ব প্রতিবেদক:

সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের গোয়াহরি গ্রামের দক্ষিণের বিস্তীর্ণ বড়বিল যেন একদিনের জন্য ফিরে গিয়েছিল শত বছর আগের গ্রামীণ বাংলায়।

শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী ‘পলো বাওয়া’ উৎসবকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার (১লা জানুয়ারি) সকাল থেকেই বিলপাড়ে জমে ওঠে এক অনন্য উৎসবমুখর পরিবেশ। প্রকৃতির কোলে ঘেরা এই বড়বিলে বার্ষিক পলো বাওয়া উৎসব দেখতে ও অংশ নিতে জড়ো হন হাজারো মানুষ।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই গোয়াহরি ও আশপাশের গ্রামের মানুষ ব্যস্ত হয়ে পড়েন উৎসবের প্রস্তুতিতে। হাতে হাতে পলো, উড়াল জাল, টেলা জাল, টানা জাল, ছিটকি জাল ও কুচা নিয়ে নির্ধারিত সময়ে সবাই একত্রিত হন বড়বিলের পাড়ে। নির্দিষ্ট সংকেতের পর মুহূর্তের মধ্যেই শত শত মানুষ একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়েন পানিতে। পানির ঢেউ আর মানুষের উচ্ছ্বাসে বড়বিল যেন প্রাণ ফিরে পায়।

কয়েক ঘণ্টাব্যাপী মাছ শিকারে ধরা পড়ে নানা প্রজাতির বড় ও ছোট মাছ। কারও পলোতে ধরা পড়ে বিশাল আকৃতির বোয়াল, কারও ঝুড়ি ভরে ওঠে রুই-কাতলা আর ঘনিয়ায়। টেলা ও ছিটকি জালে আটকা পড়ে বিলে জন্ম নেওয়া সুস্বাদু বাউশ, শোলসহ নানা জাতের দেশি মাছ। মুহূর্তে মুহূর্তে আনন্দধ্বনি, উল্লাস আর হাসিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো বিলপাড়।

এই ঐতিহ্যবাহী উৎসব দেখতে বিলের চারপাশে ভিড় জমান নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ সব বয়সের মানুষ। অনেক প্রবাসী পরিবার বিশেষভাবে এই পলো বাওয়া উৎসবকে কেন্দ্র করেই দেশে ফিরে আসেন। দীর্ঘদিন পর প্রিয়জনের সঙ্গে সাক্ষাৎ, পুরোনো স্মৃতি রোমন্থন আর একসঙ্গে মাছ ধরার আনন্দে গোয়াহরি বড়বিল পরিণত হয় এক বিশাল মিলনমেলায়।

পলোতে বড় বোয়াল ধরতে পেরে উচ্ছ্বসিত যুবক রাজু আহমদ বলেন, “নিজের হাতে এত বড় বোয়াল ধরতে পেরে খুবই আনন্দ লাগছে। আজ সবাই মাছ পেয়েছে, এটা আমাদের জন্য দারুণ খুশির দিন।”

উৎসব দেখতে যুক্তরাজ্য থেকে আসা প্রবাসী হাজী মো. তৈমুছ আলী বলেন, “গ্রামের মানুষকে একসঙ্গে আনন্দের সঙ্গে মাছ ধরতে দেখা—এই দৃশ্য দেখার জন্যই দেশে আসা। বসে বসে পলো বাওয়া উৎসব উপভোগ করছি, মনটা ভরে গেছে।”

প্রবাসী হাজী মো. আবদুল বারী ও শাহনুর হোসাইন ছাদিক বলেন, “এই উৎসব দেখার টানেই আমাদের দেশে ফেরা। গ্রামের মানুষ, ঐতিহ্য আর এই আনন্দ আমাদের কাছে পরমানন্দের মতো।”

আয়োজক কমিটির সদস্য গোলাম হোসেন মেম্বার ও ইকবাল হোসাইন বলেন, “আমাদের গোয়াহরি গ্রামের বড়বিলে প্রতিবছরই এই পলো বাওয়া উৎসব পালন করা হয়। এটি শুধু একটি মাছ ধরার আয়োজন নয়, বরং আমাদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতি ও গ্রামীণ ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। যুগ যুগ ধরে আমরা এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছি। এই উৎসব আমাদের সংস্কৃতি ও গর্বের অংশ।”

ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর মানুষের আন্তরিক মিলনে গোয়াহরি বড়বিলের পলো বাওয়া উৎসব আবারও প্রমাণ করেছে—গ্রামীণ বাংলার প্রাণ এখনও অটুট, এখনও বয়ে চলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।