আজকের সময়ের সেরা খবর
বিশ্বানাথে প্রবাসীর অর্থায়ন ও কৃষকের শ্রমে সফল লেবু বাগান, আরও ৬০ শতাংশ জমিতে মাল্টা চাষের স্বপ্ন
Spread the love

 সালেহ আহমদ সাকী

ইউটিউবে লেবু চাষের ভিডিও দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ২০২২ সালে লেবু বাগান শুরু করেছিলেন সিলেটের বিশ্বনাথের যুক্তরাজ্য প্রবাসী আবু সালেহ। প্রবাসী আবু সালেহের  জমি ও অর্থায়ন, আর দেখাশুনার দায়ীত্বে থাকা লেবু মিয়ার পরিশ্রম ও পরিচর্যায় গড়ে ওঠা সেই বাগানে এখন প্রতিদিন গড়ে দেড় থেকে দুই হাজার লেবু উৎপাদন হচ্ছে। পাইকাররা সরাসরি বাগান থেকে লেবু সংগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছেন বিশ্বনাথ ও জগন্নাথপুরের বিভিন্ন বাজারে। বর্তমানে সব খরচ বাদ দিয়ে মাসে প্রায় ৮০ হাজার টাকা আয় করছেন বলে জানিয়েছেন লেবু মিয়া।

জানা গেছে, বিশ্বনাথের দেওকলস ইউনিয়নের নিয়ামতপুর গ্রামে মোট ৮০ শতাংশ জমির ওপর গড়ে উঠেছে এ বাগান। এর বাইরে আরও প্রায় ৬০ শতাংশ জমি বর্তমানে খালি পড়ে রয়েছে। ভবিষ্যতে ওই জমিতে মাল্টা চাষ করার পরিকল্পনা রয়েছে প্রবাসীর। তবে প্রয়োজনীয় সরকারি সহযোগিতা ও কৃষি বিভাগের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে খালি জমিটিও চাষের আওতায় এনে আরও লাভবান হওয়ার আশা করছেন তিনি।

বাণিজ্যিক লেবু চাষের যাত্রা শুরু হয় ২০২২ সালে। ইউটিউবে লেবু চাষের বিভিন্ন ভিডিও দেখে তিনি প্রথমে এ চাষে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। আবু সালেহ জমি ও প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দিয়েছেন, আর লেবু মিয়া নিজের শ্রম ও সময় দিয়ে বাগানের দেখভালের দায়িত্ব নেন।

প্রথম পর্যায়ে ফরিদপুর থেকে চায়না-৩ সিডলেস জাতের ৬০০টি লেবুর চারা সংগ্রহ করা হয়। এসব চারা কিনতে প্রায় চার লাখ টাকা ব্যয় হয়। চারা রোপণের পরপরই অবশ্য বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে পড়তে হয় বাগানটিকে। ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় পানিতে প্রায় ১০০টি লেবুর চারা মারা যায়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও হাল ছাড়েননি তারা।  পরে নতুন করে আরও ১০০টি চারা রোপণ করে বাগানটি পুনরায় গড়ে তোলার তোলা হয়।

নিয়মিত পরিচর্যা, সার প্রয়োগ, সেচ ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণের ফলে বাগানের গাছগুলো এক বছর পর থেকেই ফলন দিতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে গাছগুলো বড় হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদনও বাড়তে থাকে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার লেবু সংগ্রহ ও বিক্রি করা হচ্ছে।

মৌসুম ও বাজারদরের ওপর লেবুর দাম ওঠানামা করলেও গড়ে প্রতিটি লেবু ৩ টাকা দরে বিক্রি হলে প্রতিদিন ১ হাজার ৫০০ লেবু বিক্রি করে আয় হয় প্রায় ৪ হাজার ৫০০ টাকা। সে হিসাবে মাসে মোট আয় দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। বাগানের পরিচর্যা, শ্রমিক, সার, সেচসহ বিভিন্ন খাতে মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। সব খরচ বাদ দিয়ে লেবু থেকেই মাসে প্রায় ৮০ হাজার টাকা আয় হয় বলে জানান দেখাশুনার দায়ীত্বে থাকা লেবু মিয়া।

বাগানের অন্যতম সুবিধা হলো উৎপাদিত লেবু বিক্রির জন্য তাদেরকে দূরের বাজারে যেতে হয় না। বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা সরাসরি বাগানে এসে লেবু কিনে নিয়ে যান। পরে এসব লেবু বিশ্বনাথসহ জগন্নাথপুরের বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করা হয়।

লেবু মিয়া জানান, লেবু চাষে ভালো ফল পাচ্ছেন। এখন তাদের লক্ষ্য খালি পড়ে থাকা আরও ৬০ শতাংশ জমিকে কাজে লাগানো। সেখানে মাল্টা চাষ করতে চান তারা। তবে নতুন বাগান করতে প্রয়োজনীয় অর্থ, উন্নত জাতের চারা, প্রযুক্তিগত পরামর্শ ও নিয়মিত কৃষি সহায়তা প্রয়োজন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তারা জমিটিতে মাল্টা চাষ করে আরও বেশি লাভবান হতে পারবেন বলে আশা করছেন।

তিনি বলেন, কৃষি বিভাগের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও সহযোগিতা পেলে শুধু নিজেদের আয়ই নয়, ভবিষ্যতে আরও জমিতে ফলের বাগান করার পাশাপাশি অন্য কৃষকদেরও উৎসাহিত করা সম্ভব হবে।

এ বিষয়ে বিশ্বনাথ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বিল্লাল হোসেনের সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, কৃষকদের ফলদ ও অর্থকরী ফসল চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে। আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা এবং উন্নত জাতের চারা ব্যবহারের বিষয়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকের প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে বলেও তিনি জানান।

কৃষি উদ্যোক্তাদের মতে, প্রবাসী আবু সালেহের মতো উদ্যোগগুলো স্থানীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। পতিত জমি চাষের আওতায় এনে লেবু, মাল্টাসহ বিভিন্ন ফলের বাগান গড়ে তোলা গেলে একদিকে যেমন কৃষকের আয় বাড়বে, অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে।

লেবু মিয়ার শ্রম, প্রবাসীর অর্থায়ন এবং কৃষিজমির যথাযথ ব্যবহারের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ৮০ শতাংশের লেবু বাগান এখন তাদের স্বপ্ন পূরণের পথে একটি সফল উদাহরণ। সামনে আরও ৬০ শতাংশ জমিতে মাল্টা চাষের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এ উদ্যোগটি আরও বড় আকারে বাণিজ্যিক কৃষি প্রকল্পে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।