বারবার ভূমিকম্পে কেঁপে উঠছে সিলেট: ২৩ ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভাঙার সিদ্ধান্ত জেলা প্রশাসনের
এই সময় ডেস্ক:
ভূমিকম্পে বারবার কেঁপে উঠছে সিলেট। কখনো সীমান্তের ওপারে ভারতের মেঘালয়ের ডাউকি ফল্ট, কখনো আবার উৎপত্তিস্থল সিলেট বিভাগের ভেতরেই। এমনকি ঢাকাকেন্দ্রিক ভূমিকম্পও অনুভূত হচ্ছে সিলেটে। একের পর এক কম্পনে আতঙ্কে দিন কাটছে সিলেট নগরীর বাসিন্দাদের।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা স্থানীয় ফল্টগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠায় ভূমিকম্পের হার দ্রুত বাড়ছে। ভূতাত্ত্বিকভাবে ‘ডেঞ্জার জোন’-এ থাকা সিলেটে বড় ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকিও তীব্র হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে শহরের বহু পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনকে ‘যমদূতের মতো’ ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করছেন বিশেষজ্ঞরা। বড় ভূমিকম্প হলে এসব ভবন ধসে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।
অবশেষে নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম জানান, নগরীর ২৩টি বিপজ্জনক ভবন ইতোমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলো খুব শিগগিরই ভেঙে ফেলা হবে। এর মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি—দুই ধরনের ভবনই রয়েছে। তিনি জানান, আগামী সপ্তাহ থেকেই এসব ভবন অপসারণের কাজ শুরু হবে।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, নগরীর বহু পুরনো ভবনের নকশায় ভূমিকম্প প্রতিরোধী প্রযুক্তি নেই। তীব্র ভূকম্পনে এসব ভবনেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা। ঝুঁকির মধ্যে থাকা ভবনগুলোয় রয়েছে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মার্কেট ও আবাসিক ভবন।
এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় তিন দফা ভূমিকম্পের পর সিলেটসহ আশপাশের জেলাগুলোর মানুষ আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে।
শনিবার (২২ নভেম্বর) সন্ধ্যা ৬টা ৬ মিনিটে এক সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি ভূমিকম্প (৩.৭ ও ৪.৩ মাত্রা) এবং সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটে ৩.৩ মাত্রার আরেকটি ভূকম্পন অনুভূত হয়।
এর ঠিক আগের দিন শুক্রবার (২১ নভেম্বর) ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে দুই শিশুসহ ১০ জনের মৃত্যু হয় এবং আহত হয় কয়েকশ মানুষ।
জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম বলেন, “চিহ্নিত ভবনগুলোতে এখনো অনেকে বসবাস করছে বা ব্যবসা পরিচালনা করছে। দ্রুত অপসারণ না হলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। নাগরিকদের সুরক্ষার জন্যই জরুরি ভিত্তিতে ভাঙার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, উদ্ধারকাজে সবচেয়ে বড় বাধা শহরের সংকীর্ণ রাস্তা—ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশ করতে না পারলে রেসকিউ কার্যক্রম ব্যাহত হবে।
২০১৯ সালে সিসিক নগরীর মোট ২৪টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি করেছিল। এর মধ্যে ৬টি সংস্কার করে ঝুঁকিমুক্ত করা হলেও ১৮টি ভবন এখনো বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে—সমবায় ব্যাংক ভবন মার্কেট, মধুবন মার্কেট, সুরমা মার্কেট, মিতালী ম্যানশন, রাজা ম্যানশন, নবপুষ্প-২৬/এ, আজমীর হোটেলসহ বেশ কিছু আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন।
এ ছাড়া পূর্বের তালিকা থেকে কালেক্টরেট ভবন-৩, বন্দরবাজার সিটি সুপার মার্কেটের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ, কিবরিয়া লজ, বনকলাপাড়ার নূরানী-১৪, ধোপাদিঘীর পাড়ের পৌর শপিং সেন্টারসহ কয়েকটি ভবন অপসারণ বা সংস্কার করা হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, চিহ্নিত ভবনগুলোতে বড় বড় ফাটল, হেলে পড়া দেয়াল, নড়বড়ে সিঁড়ি—সব মিলিয়ে বাসিন্দারা চরম আতঙ্কে দিন পার করছেন। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত সিলেট ও মেঘালয় অঞ্চলে ধারাবাহিক ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল একাধিকবার সিলেট বিভাগই ছিল, যা ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

