মহান শহিদ দিবসে উত্তর বিশ্বনাথ আমজদ উল্লাহ ডিগ্রী কলেজে ব্যাপক কর্মসূচি
বিশ্বনাথ প্রতিবেদক:
গভীর শ্রদ্ধা, যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগম্ভীর পরিবেশে মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করেছে উত্তর বিশ্বনাথ আমজদ উল্লাহ ডিগ্রী কলেজ। দিবসটি উপলক্ষে কলেজ প্রাঙ্গণে আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পুরো আয়োজনটি হয়ে ওঠে স্মরণীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ভাষা শহিদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া পরিচালনা করা হয়।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলা বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন। সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি কেবল একটি তারিখ নয়; এটি বাঙালির আত্মমর্যাদা, সাহস এবং আত্মপরিচয়ের প্রতীক। মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিরস্ত্র ছাত্রদের আত্মত্যাগ বিশ্ব ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা নত না করতে। ভাষার প্রশ্নে আপস না করার যে শিক্ষা আমরা পেয়েছি, সেটিই পরবর্তীতে স্বাধীনতা সংগ্রামের বীজ বপন করেছে। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, বাংলা ভাষার শুদ্ধ চর্চা, সৃজনশীল ব্যবহার এবং গবেষণাভিত্তিক অধ্যয়নের মাধ্যমে ভাষাকে সমৃদ্ধ করা এখন সময়ের দাবি।
ইংরেজি বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক আব্দুর রশীদ তার বক্তব্যে বলেন, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এখন বৈশ্বিক স্বীকৃত একটি দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির অস্তিত্ব রক্ষায় এ দিবসের গুরুত্ব অপরিসীম। তিনি বলেন, মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো মানে নিজের শেকড়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। বিশ্বায়নের এই যুগে বহুভাষা শেখা প্রয়োজন, তবে নিজের ভাষার মর্যাদা ও শুদ্ধতা রক্ষা করা আরও বেশি জরুরি।
সহকারী অধ্যাপক আব্দুল মুনিম পারভেজ বলেন, ভাষা আন্দোলনের চেতনা থেকেই স্বাধীনতার চেতনার বিকাশ ঘটেছে। তিনি বলেন, ইতিহাস শুধু জানার বিষয় নয়, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানকে গড়ে তোলার বিষয়। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি আহ্বান জানান, তারা যেন দেশপ্রেম, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধে উজ্জীবিত হয়ে জাতির উন্নয়নে অবদান রাখে।
এছাড়া বক্তব্য রাখেন মোস্তফা কামাল ও খায়ের আহমদ। তারা বলেন, ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগ আমাদের জাতিসত্তার ভিত মজবুত করেছে। আজ প্রযুক্তিনির্ভর সমাজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার শুদ্ধ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। তারা তরুণ প্রজন্মকে ভাষার বিকাশে সৃজনশীল উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ক্রীড়া শিক্ষক আমিনুল হক, হিসাবরক্ষক আব্দুস সালাম, আশিকুর রহমান, ফখরুজ্জামান খান, জুয়েল আহমদ, রুবেল আহমদ, নন্দগোপাল দেবসহ কলেজের সর্বস্তরের শিক্ষার্থী। তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত ও অর্থবহ।
সভা শেষে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে আবৃত্তি ও দেশাত্মবোধক সংগীত পরিবেশিত হয়। আবৃত্তিতে উঠে আসে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, আর সংগীতে ধ্বনিত হয় দেশপ্রেম ও আত্মমর্যাদার বার্তা। উপস্থিত সবার মাঝে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
বক্তারা ভাষা শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, একুশের চেতনা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস সচেতন করে তোলার মধ্য দিয়েই শহিদদের আত্মত্যাগের প্রকৃত সম্মান জানানো সম্ভব।
সার্বিকভাবে, মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এ কর্মসূচি শিক্ষার্থীদের মাঝে ভাষা আন্দোলনের আদর্শ ও চেতনা আরও সুদৃঢ় করবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

