আজকের সময়ের সেরা খবর
প্রটোকল ভেঙে পুতিনকে স্বাগত মোদীর, দিল্লিতে শুরু ভারত–রাশিয়া কূটনীতির নতুন অধ্যায়

এইসময় ডেস্ক:

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে পৌঁছেছেন। বিরল কূটনৈতিক সৌজন্যে বিমানবন্দরের রানওয়েতে দাঁড়িয়ে তাকে স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সাধারণত বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের অভ্যর্থনা জানানোর রীতি অনুযায়ী মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকেন। কিন্তু এবার সেই প্রোটোকল ভেঙেই ব্যক্তিগতভাবে পুতিনকে বরণ করে নিলেন মোদী। করমর্দনের পর আলিঙ্গন—রানওয়েতে দাঁড়িয়েই দিল্লি–মস্কোর ঘনিষ্ঠতার বার্তা দিলেন দুই নেতা।

সফরকালে পুতিন অংশ নেবেন ২৩তম ভারত–রাশিয়া বার্ষিক শীর্ষ বৈঠকে। দিল্লির হায়দরাবাদ হাউজে আয়োজিত এ বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বিভিন্ন ইস্যুতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সই হতে পারে। বিশেষ করে রাশিয়া থেকে অতিরিক্ত এস–৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার বিষয়ে নতুন সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সফরের আগে রুশ পার্লামেন্ট ভারতের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ‘রেসিপ্রোকাল এক্সচেঞ্জ অফ লজিস্টিক সাপোর্ট’ (RELOS) অনুমোদন করেছে। এই চুক্তির মাধ্যমে ভারত রাশিয়ার বিভিন্ন সেনাঘাঁটি ব্যবহার করতে পারবে; যার মধ্যে তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান, কাজাখস্তান, উজবেকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থিত রুশ সামরিক স্থাপনাও রয়েছে। ফলে রাশিয়ার ঘাঁটি থেকে ভারতীয় রণতরী, ডুবোজাহাজ, যুদ্ধবিমান মোতায়েন ও রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা গ্রহণে নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

ভারত–রাশিয়া সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। সোভিয়েত যুগ থেকে চলে আসা এই কৌশলগত বন্ধুত্ব সাম্প্রতিক ভূ–রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও অটুট রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মাঝে ভারত রাশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাজারে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৩৫ শতাংশই আসে রাশিয়া থেকে—যেখানে যুদ্ধের আগে এ হার ছিল মাত্র ২.৫ শতাংশ।

তবে এ পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অস্বস্তিকর। রুশ তেল কেনা বন্ধে চাপ বাড়াতে গত অক্টোবরে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে। এরপর থেকে ভারত কিছুটা রুশ তেল আমদানি কমালেও মস্কো চাইছে দিল্লি আবার অর্ডার বাড়াক। সেই প্রত্যাশায়ই পুতিনের এই সফরকে দেখছে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মহল।

ভারতের জন্যও এই সফর তাৎপর্যপূর্ণ। কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে মস্কো ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমান্তরাল সম্পর্ক রাখা এখন মোদীর বড় চ্যালেঞ্জ। ইউরোপীয় মিত্রদের চাপও বাড়ছে, যেন দিল্লি–মস্কোর ঘনিষ্ঠতা ভারতের পশ্চিমা অংশীদারত্বকে ছাপিয়ে না যায়।

এদিকে দুই দেশই ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। ২০২০ সালে যেখানে দুই দেশের বাণিজ্য ছিল মাত্র ৮.১ বিলিয়ন ডলার, ২০২৫ সালের মার্চ শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৮.৭২ বিলিয়ন ডলারে—মূলত ছাড়ে কেনা রুশ তেলের কারণে। তবে বাণিজ্যের ভারসাম্য রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে থাকায় অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ ও সহযোগিতা বাড়াতে চাইছে ভারত।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কৌশলগত দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও ভূ–রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই নয়াদিল্লিতে শুরু হলো ভারত–রাশিয়ার কূটনীতির নতুন অধ্যায়। মোদী–পুতিন বৈঠক তাই শুধু দ্বিপক্ষীয় নয়, বৈশ্বিক রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।