মৃত প্রায় বাসিয়া নদীর কি ফিরবে প্রাণ? ২ মে’কে ঘিরে আশায় বুক বাঁধছে এ জনপদ
বিশ্বনাথ প্রতিনিধি:
সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার বুক চিরে বয়ে যাওয়া এক সময়ের খরশ্রোতা বাসিয়া নদী আজ অস্তিত্ব সংকটে। দখল, দূষণ আর বিষাক্ত বর্জ্যের স্তূপে নদীটি এখন প্রায় মৃত। যে নদী দিয়ে এক সময় লঞ্চ-স্টিমার আর পালতোলা নৌকার চলাচল ছিল নিত্যদিনের দৃশ্য, কালের বিবর্তনে তা এখন সংকুচিত হয়ে একটি সরু খালে পরিণত হয়েছে। নদীটি এখন শুধু একটি জলধারা নয়, বরং অবহেলা আর অনিয়মের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। বিশ্বনাথ পৌর শহরসহ নদীর দুই তীর দখলদারিত্ব ও ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। রাতের আঁধারে বাসা-বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য ফেলা হয় নদীতে, আর দিনের বেলায় সেই স্তূপে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ফলে পচা বর্জ্য আর ধোঁয়ার তীব্র দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে আশপাশের জনজীবন।
এই ভয়াবহ পরিবেশের প্রভাব পড়েছে জনস্বাস্থ্যের ওপরও। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিনই শিশু ও বৃদ্ধসহ নানা বয়সের মানুষ শ্বাসকষ্ট, বমি ও নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। অনেকে বাধ্য হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। নদীর দুই তীরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও মন্দিরে আসা মানুষও চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। শিক্ষার্থীরা ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারছে না, ধর্মপ্রাণ মানুষদের স্বাভাবিক চলাচলেও সৃষ্টি হয়েছে বাধা। বিশ্বনাথের নতুন ও পুরাতন বাজারের ব্যবসায়ীরাও চরম দুর্দশার মধ্যে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। দুর্গন্ধের কারণে ক্রেতা কমে যাওয়ায় ক্ষক্ষতির মুখে পড়ছেন তারা। পরিস্থিতি সামাল দিতে সম্প্রতি পৌরসভার পক্ষ থেকে নদীর তীরের ময়লার স্তূপে ব্লিচিং পাউডার ও কেরোসিন ছিটানো হলেও তা কোনো স্থায়ী সমাধান নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তথ্য অনুযায়ী, সিলেটের জালালাবাদ থানার মাসুকগঞ্জ বাজার এলাকায় সুরমা নদী থেকে বাসিয়া নদীর উৎপত্তি হয়ে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার রাণীগঞ্জের স্বাধীন বাজার এলাকায় কুশিয়ারা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। প্রায় ৫৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীর উৎস ও নিষ্কাশন মুখ ভরাট হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি দুই তীরে অবৈধ দখলের কারণে নদীটি আজ মৃত্যুর মুখে। এক সময় প্রায় ২০০ মিটার প্রশস্ত এই নদী এখন এতটাই সংকুচিত হয়েছে যে, শুকনো মৌসুমে শিশুরাও হেঁটে পার হতে পারে। বর্ষাকালেও এটিকে নদী বলে চেনার উপায় থাকে না।
বিশ্বনাথ উপজেলা ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, নদীর দুই তীরে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য ১৮৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা (নং ০৪/২০১৭) চলমান রয়েছে। পাশাপাশি দখলদারদের করা দুটি রিট মামলাও (নং ৯১৩৫/২০১৭ ও ৫৩৪০/২০১৭) হাইকোর্টে বিচারাধীন। দীর্ঘ ৮ বছরেও এসব স্থাপনা উচ্ছেদে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশ স্থানীয়রা।
তবে দীর্ঘ অন্ধকারের পর এবার দেখা যাচ্ছে আশার আলো। আগামী ২ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য উদ্বোধনের খবর ছড়িয়ে পড়তেই বাসিয়া পাড়ের মানুষের মাঝে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তারা বিশ্বাস করছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আবারও প্রাণ ফিরে পেতে পারে ঐতিহ্যবাহী বাসিয়া নদী।
স্থানীয়দের ধারণা, নদীর উৎসমুখ খুলে দেওয়া গেলে ভরা বর্ষা মৌসুমে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ শুরু হবে এবং সেই প্রবল স্রোতই ধীরে ধীরে নদীর পুরোনো গতিপথ নিজেই পুনর্গঠন করে নেবে। স্থানীয়দের ভাষায়, “যে নদীর বুক চিরে এক সময় জীবন চলত, সেই নদী যদি আবার জেগে ওঠে তাহলেই বদলে যাবে পুরো জনপদের চিত্র।”



