বনার্ঢ্য আয়োজনে শিক্ষার্থীদের ভালবাসায়সিক্ত হলেন শিক্ষক জালাল উদ্দীন
বিশ্বনাথ প্রতিনিধি
সিলেটের বিশ্বনাথে বর্ণাঢ্য ও আবেগঘন আয়োজনে সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী এবং এলাকাবাসীর অকৃত্রিম ভালোবাসায় সিক্ত হলেন পৌর শহরের ভোগশাইল গ্রামস্থ শাহপিন উচ্চ বিদ্যালয়ের গণিত শিক্ষক মো. জালাল উদ্দীন বিএসসি। দীর্ঘ প্রায় সাড়ে ২৭ বছরের বর্ণাঢ্য শিক্ষকতা জীবন শেষে অবসরে যাওয়া এই গুণী শিক্ষককে সম্মান জানাতে দেশে-বিদেশে অবস্থানরত প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে আয়োজন করা হয় বিশাল বিদায় সংবর্ধনার।
বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বিদ্যালয় সম্মুখ মাঠে নানা কর্মসূচি ও হৃদয়ছোঁয়া পরিবেশের মধ্য দিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে সম্পন্ন হয় সর্বজন শ্রদ্ধেয় এই শিক্ষকের বিদায় সংবর্ধনা। জানা যায়, মো. জালাল উদ্দীন বিএসসি ১৯৯৮ সালের ১৮ জুলাই শাহপিন উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদান করে টানা ২৭ বছর ৫ মাস ১৩ দিন নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে শিক্ষকতা করেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থীকে গণিতের পাশাপাশি জীবনবোধ ও শৃঙ্খলার শিক্ষা দিয়েছেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সিলেট-২ (বিশ্বনাথ-ওসমানীনগর) আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের সংসদ সদস্য প্রার্থী ইলিয়াসপত্নী তাহসিনা রুশদীর লুনা। তিনি বলেন, পাঠ্যবইয়ের শিক্ষা মানুষকে জ্ঞান দেয়, কিন্তু সেই জ্ঞানকে আলোকিত ও অর্থবহ করে তোলে মূল্যবোধ, নীতিবোধ ও মানবিক শিক্ষা। আর এই মহান দায়িত্বটি যুগ যুগ ধরে পালন করে যাচ্ছেন শিক্ষকরা, যারা প্রকৃত অর্থে মানুষ গড়ার কারিগর।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল অর্জন করা নয়। বরং দেশপ্রেম, সততা, মানবিকতা ও নৈতিকতার আলোকে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। আজ আমরা এমন এক সময় পার করছি, যখন সমাজে নীতি-নৈতিকতার অভাব আমাদের অগ্রগতিকে বারবার প্রশ্নের মুখে ফেলছে। দুর্নীতি, স্বার্থপরতা ও অন্যায়ের প্রতিযোগিতা সমাজের গভীরে শিকড় গেড়ে বসেছে। এই সংকটময় সময়ে শিক্ষকরা হচ্ছেন আলোর দিশারি। তরুণ প্রজন্মকে বুঝতে হবে, বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা থাকলেও প্রকৃত শক্তি অর্জিত হয় সুশিক্ষা ও যোগ্যতার মাধ্যমে। নিজেদের যোগ্য করে তুলতে পারলেই বিশ্ব প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব।
সংবর্ধিত অতিথির বক্তব্যে বিদায়ী গণিত শিক্ষক মো. জালাল উদ্দীন বিএসসি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, বিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী এবং এলাকাবাসীর উদ্যোগে আয়োজিত আজকের এই ভালোবাসার সংবর্ধনা আমাকে আজীবনের ঋণে আবদ্ধ করেছে। আপনাদের এই সম্মান আমি কোনো দিন ভুলব না। আমি শিক্ষকতা জীবনে কখনও জেনে-শুনে দায়িত্ব পালনে অবহেলা করিনি। শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কখনও কঠোর হয়েছি, আবার কখনও সন্তানের মতো আগলে রেখেছি।
তিনি বলেন, আজ আমি সবচেয়ে বেশি গর্ব অনুভব করছি এই কারণে যে আমার অসংখ্য শিক্ষার্থী আজ দেশে-বিদেশে স্ব-স্ব অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত। তাদের সাফল্যই আমার শিক্ষকতা জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে আমাদের প্রিয় শাহপিন উচ্চ বিদ্যালয়কে আরও অনেক দূর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
শাহপিন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা কমিটির সদস্য আলহাজ্ব লেচু মিয়ার সভাপতিত্বে এবং সিনিয়র সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান, মো. আনছার আলী ও সহকারী শিক্ষক মোছা. ফিরোজা খাতুনের যৌথ পরিচালনায় অনুষ্ঠিত এই বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন বিশ্বনাথ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. বদিউজ্জামান আহমদ, উপজেলা পরিষদের সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গৌছ খান, সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মাওলানা হাবিবুর রহমান, সদর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জালাল উদ্দিন, রাগীব রাবেয়া ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও বুনন সম্পাদক কবি খালেদ উদ্দীন, উত্তর বিশ্বনাথ দ্বি-পাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি জসিম উদ্দিন খান, শাহপিন উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি মো. মনির মিয়া মঈনুল এবং ভোগশাইল কে আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোছাম্মৎ সামিয়া বেগম।
প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের পক্ষ থেকে স্মৃতিচারণমূলক বক্তব্য রাখেন হাবিবুল্লাহ মিসবাহ। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে স্মৃতিচারণ করেন শিক্ষার্থী সামিরা বেগম ও তাবাসসুম জান্নাত মাঈশা। অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের পক্ষে মানপত্র পাঠ করেন ছিদ্দিকুর রহমান এবং শিক্ষার্থীদের পক্ষে মানপত্র পাঠ করেন দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী তানভীর আহমদ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করেন নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী মো. আরিবুর রহমান আরিফ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেন। সবশেষে দোয়া পরিচালনা করেন ভোগশাইল বায়তুর জান্নাত জামে মসজিদের ইমাম লায়েক আহমদ লতিফি।
বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক, এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত থেকে প্রিয় শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানান।

