আজকের সময়ের সেরা খবর
দেশজুড়ে ভূমিকম্পে আতঙ্ক— করণীয় জানালো ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স

এই সময় ডেস্ক:

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এর মাত্র একদিন পর শনিবার (২২ নভেম্বর) আরও তিন দফা হালকা কম্পন অনুভূত হয়। পর্যায়ক্রমে ভূকম্পন অব্যাহত থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

এ পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। ভূমিকম্পের সময় নিজের ও আশপাশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা কয়েকটি নির্দেশনা দিয়েছে।

ভূমিকম্পের সময় করণীয়

১. আতঙ্কিত না হয়ে ধীরস্থির থাকুন

ভূকম্পন শুরু হলে প্রথমেই মাথা ঠাণ্ডা রাখুন। ভবনের নিচতলায় থাকলে দ্রুত নিরাপদ খোলা এলাকায় বের হয়ে যান। ভিড় এড়িয়ে চলুন।

২. বহুতল ভবনে Drop–Cover–Hold পদ্ধতি অনুসরণ করুন

  • নিচু হয়ে বসুন
  • শক্ত টেবিল/ডেস্কের নিচে আশ্রয় নিন
  • টেবিলের খুঁটি শক্ত করে ধরে রাখুন
    এ ছাড়া কলাম বা বিমের নিচে গিয়ে মাথা বাঁচাতে বালিশ, কুশন বা নরম বস্তু ব্যবহার করুন।

৩. লিফট ব্যবহার করবেন না

ভূমিকম্প চলাকালে লিফটে ওঠা বা নামা ঝুঁকিপূর্ণ। কম্পন থেমে গেলে দ্রুত বৈদ্যুতিক সংযোগ ও গ্যাস লাইন বন্ধ করুন।

৪. ঝুঁকিপূর্ণ জিনিসপত্র থেকে দূরে থাকুন

বারান্দা, ব্যালকনি, জানালা, আলমারি, বুকশেলফ বা কোনো ঝুলন্ত ভারী জিনিসের কাছ থেকে দূরে অবস্থান করুন। টর্চলাইট, হেলমেট, জরুরি ওষুধ, প্রথমিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ও বাঁশি হাতের কাছে রাখুন।

৫. বাইরে থাকলে খোলা স্থানে আশ্রয় নিন

গাছ, উঁচু ভবন, বৈদ্যুতিক খুঁটি বা দেয়ালচাপা পড়তে পারে এমন যেকোনো জায়গা এড়িয়ে চলুন।

৬. গাড়িতে থাকলে নিরাপদ স্থানে থামুন

ফ্লাইওভার, ওভারব্রিজ, বড় গাছ বা বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে দূরে গাড়ি থামান এবং কম্পন শেষ না হওয়া পর্যন্ত গাড়ির মধ্যেই থাকুন।

৭. আফটারশকের জন্য সতর্ক থাকুন

প্রাথমিক ভূমিকম্পের পর আবারও কম্পন অনুভূত হতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত ভবন, ব্রিজ, দেয়াল বা দুর্বল স্থাপনা থেকে দূরে থাকুন, কারণ পরবর্তী কম্পনে এগুলো ধসে পড়তে পারে।

৮. সম্মিলিত সচেতনতাই ক্ষতি কমাতে পারে

নিজে সচেতন থাকার পাশাপাশি পরিবার, প্রতিবেশী ও আশপাশের মানুষকেও সতর্ক করুন। জরুরি প্রয়োজনে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের হটলাইন ১০২ নম্বরে যোগাযোগ করতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ভূমিকম্প: যেভাবে পাল্টে দিতে পারে পৃথিবীর

এই সময় ডেস্ক:

ভূমিকম্প এক প্রাকৃতিক শক্তি, যা মুহূর্তের মধ্যেই পৃথিবীর ভূত্বককে বদলে দিতে সক্ষম। ভূত্বকের ভেতরে সঞ্চিত শক্তির আকস্মিক মুক্তির ফলে সৃষ্ট এই কম্পন কখনও ভূমিতে সৃষ্টি করে গভীর ফাটল, কখনও ঘটায় ভয়াবহ ভূমিধস। অনুকূল পরিস্থিতিতে এর প্রভাবে মাটির তরলীকরণও দেখা দিতে পারে, যা সমতল ভূমির স্থিতিশীলতাকে বিপর্যস্ত করে দেয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকটোনিক প্লেটগুলোর সংঘর্ষই ভূমিকম্পের মূল উৎস। দুটি প্লেট যখন একে অপরের দিকে সরে আসে, তখন ভূত্বকের গভীরে প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়। এই চাপ নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে শিলাস্তর ভেঙে যায় বা ভাঁজ হয়ে ওপরে উঠে আসে। ঠিক এই ভাঁজ প্রক্রিয়া থেকেই সৃষ্টি হয় ভঙ্গিল পর্বতশ্রেণী। ফলে ভূমিকম্পকে শুধু ধ্বংস নয়, নতুন ভূ-আকার সৃষ্টিরও অনুঘটক বলা যায়।

ভূমিকম্পের শক্তি ভূ-উপরিস্থ রূপ বদলে দেওয়ার পাশাপাশি প্রভাব ফেলে জলভাগেও। শক্তিশালী ভূকম্পনের ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হতে পারে, এমনকি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতায়ও দেখা দিতে পারে ওঠানামা। আর সমুদ্রের নিচে বড় ধাক্কা তৈরি হলে সেখান থেকে উৎপন্ন হতে পারে ভয়াবহ সুনামি, যা অল্প সময়েই উপকূলীয় জনপদকে প্লাবিত করে দিতে সক্ষম।

শহরাঞ্চলে ভূমিকম্পের প্রভাব আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। বড় মাত্রার ভূকম্পনে ধসে পড়ে ভবন, ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেতু, সড়ক ও নানান অবকাঠামো। বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় মানুষের জীবনযাত্রায়। যেমন—একটি ভয়াবহ ভূমিকম্পে রাশিয়ায় প্রায় ২০ লাখ মানুষ গৃহহারা হয়ে পড়েছিল।

স্বল্প সময়ের এই বিপর্যয় দীর্ঘমেয়াদে রেখে যায় গভীর প্রভাব—সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত সব ক্ষেত্রেই। তাই ভূমিকম্পকে শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে নয়, পৃথিবীর দীর্ঘকালীন রূপান্তর প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেও দেখা হয়। ধ্বংসের মধ্য দিয়েই পৃথিবী কখনো কখনো পায় নতুন ভূ-রূপ।

বারবার ভূমিকম্পে কেঁপে উঠছে সিলেট: ২৩ ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভাঙার সিদ্ধান্ত জেলা প্রশাসনের

এই সময় ডেস্ক:

ভূমিকম্পে বারবার কেঁপে উঠছে সিলেট। কখনো সীমান্তের ওপারে ভারতের মেঘালয়ের ডাউকি ফল্ট, কখনো আবার উৎপত্তিস্থল সিলেট বিভাগের ভেতরেই। এমনকি ঢাকাকেন্দ্রিক ভূমিকম্পও অনুভূত হচ্ছে সিলেটে। একের পর এক কম্পনে আতঙ্কে দিন কাটছে সিলেট নগরীর বাসিন্দাদের।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা স্থানীয় ফল্টগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠায় ভূমিকম্পের হার দ্রুত বাড়ছে। ভূতাত্ত্বিকভাবে ‘ডেঞ্জার জোন’-এ থাকা সিলেটে বড় ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকিও তীব্র হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে শহরের বহু পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনকে ‘যমদূতের মতো’ ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করছেন বিশেষজ্ঞরা। বড় ভূমিকম্প হলে এসব ভবন ধসে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।

অবশেষে নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম জানান, নগরীর ২৩টি বিপজ্জনক ভবন ইতোমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলো খুব শিগগিরই ভেঙে ফেলা হবে। এর মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি—দুই ধরনের ভবনই রয়েছে। তিনি জানান, আগামী সপ্তাহ থেকেই এসব ভবন অপসারণের কাজ শুরু হবে।

ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, নগরীর বহু পুরনো ভবনের নকশায় ভূমিকম্প প্রতিরোধী প্রযুক্তি নেই। তীব্র ভূকম্পনে এসব ভবনেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা। ঝুঁকির মধ্যে থাকা ভবনগুলোয় রয়েছে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মার্কেট ও আবাসিক ভবন।

এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় তিন দফা ভূমিকম্পের পর সিলেটসহ আশপাশের জেলাগুলোর মানুষ আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে।
শনিবার (২২ নভেম্বর) সন্ধ্যা ৬টা ৬ মিনিটে এক সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি ভূমিকম্প (৩.৭ ও ৪.৩ মাত্রা) এবং সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটে ৩.৩ মাত্রার আরেকটি ভূকম্পন অনুভূত হয়।
এর ঠিক আগের দিন শুক্রবার (২১ নভেম্বর) ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে দুই শিশুসহ ১০ জনের মৃত্যু হয় এবং আহত হয় কয়েকশ মানুষ।

জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম বলেন, “চিহ্নিত ভবনগুলোতে এখনো অনেকে বসবাস করছে বা ব্যবসা পরিচালনা করছে। দ্রুত অপসারণ না হলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। নাগরিকদের সুরক্ষার জন্যই জরুরি ভিত্তিতে ভাঙার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, উদ্ধারকাজে সবচেয়ে বড় বাধা শহরের সংকীর্ণ রাস্তা—ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশ করতে না পারলে রেসকিউ কার্যক্রম ব্যাহত হবে।

২০১৯ সালে সিসিক নগরীর মোট ২৪টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি করেছিল। এর মধ্যে ৬টি সংস্কার করে ঝুঁকিমুক্ত করা হলেও ১৮টি ভবন এখনো বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে—সমবায় ব্যাংক ভবন মার্কেট, মধুবন মার্কেট, সুরমা মার্কেট, মিতালী ম্যানশন, রাজা ম্যানশন, নবপুষ্প-২৬/এ, আজমীর হোটেলসহ বেশ কিছু আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন।

এ ছাড়া পূর্বের তালিকা থেকে কালেক্টরেট ভবন-৩, বন্দরবাজার সিটি সুপার মার্কেটের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ, কিবরিয়া লজ, বনকলাপাড়ার নূরানী-১৪, ধোপাদিঘীর পাড়ের পৌর শপিং সেন্টারসহ কয়েকটি ভবন অপসারণ বা সংস্কার করা হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, চিহ্নিত ভবনগুলোতে বড় বড় ফাটল, হেলে পড়া দেয়াল, নড়বড়ে সিঁড়ি—সব মিলিয়ে বাসিন্দারা চরম আতঙ্কে দিন পার করছেন। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত সিলেট ও মেঘালয় অঞ্চলে ধারাবাহিক ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল একাধিকবার সিলেট বিভাগই ছিল, যা ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।