এই সময় ডেস্ক:
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই মামলায় দায় স্বীকার করে ‘রাজসাক্ষী’ হওয়া পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (১৭ নভেম্বর) চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
রায়ে আদালত বলেন, শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। মোট পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে দুইটিতে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড এবং আরেকটিতে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অপরদিকে, আসাদুজ্জামান খান কামালকে একটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
গত ২৩ অক্টোবর শুনানি শেষে রায়ের তারিখ ঘোষণার লক্ষ্যে ১৩ নভেম্বর দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। এরপর ১৩ নভেম্বর রায় ঘোষণার জন্য ১৭ নভেম্বর দিন নির্ধারণ করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম। পলাতক দুই আসামির পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাডভোকেট মো. আমির হোসেন।
এর আগে গত ১০ জুলাই মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। একই দিনে সাবেক আইজিপি মামুনের ‘অ্যাপ্রুভার’ হিসেবে দেওয়া আবেদনও মঞ্জুর করা হয়।
মামলার অভিযোগসমূহ:
১. উসকানিমূলক বক্তব্য ও গণহত্যা:
গত বছরের ১৪ জুলাই গণভবনের সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারী ছাত্রদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ ও ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ উল্লেখ করে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ আনা হয় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। এরপর তার নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সশস্ত্র দলীয় কর্মীদের মাধ্যমে সারা দেশে দেড় হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা এবং প্রায় ২৫ হাজারকে আহত করা হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে।
২. প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ:
শেখ হাসিনা হেলিকপ্টার, ড্রোন ও মারণাস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের নির্মূলের নির্দেশ দেন—এমন অভিযোগও প্রমাণিত হয়েছে বলে জানায় আদালত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এএসএম মাকসুদ কামাল এবং সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে কথোপকথনের অডিও রেকর্ডও মামলায় প্রমাণ হিসেবে যুক্ত হয়।
৩. রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ হত্যা:
এই ঘটনায় শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান ও মামুনকে সরাসরি অভিযুক্ত করা হয়।
৪. চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যা:
রাজধানীতে আন্দোলনকালে ছয়জন নিরস্ত্র মানুষকে গুলি করে হত্যা করার অভিযোগেও তাদের বিরুদ্ধে দায় প্রমাণিত হয়।
৫. আশুলিয়ায় ছয়জনকে পুড়িয়ে হত্যা:
এ ঘটনায়ও তিন আসামিকেই অভিযুক্ত করে আদালত।
রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে মামলার আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো একে বাংলাদেশের বিচার ইতিহাসে ‘গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক’ হিসেবে আখ্যা দেন।