সবসময় অজু অবস্থায় থাকা: কুরআন ও হাদিসের আলোকে পবিত্রতার এক অনন্য সাধনা
ইসলামে পবিত্রতার ধারণা অত্যন্ত বিস্তৃত ও গভীর। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বারবার মুমিনদের পরিচ্ছন্নতা, শুচিতা ও আত্মিক পবিত্রতার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। ইবাদতের পূর্বশর্ত হিসেবে অজুর বিধান রাখার মাধ্যমে ইসলাম মুসলমানের জীবনযাত্রাকে সুসংগঠিত, পরিচ্ছন্ন এবং সময়ানুবর্তী করে তুলেছে। সেই পবিত্রতার ধারাবাহিকতায় বহু আলেম ও ইসলামি ব্যক্তিত্ব সবসময় অজু অবস্থায় থাকার অভ্যাস তৈরি করেছেন। এই অভ্যাস আত্মার পরিশুদ্ধি, নৈতিকতা ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত।
কুরআনের আলোকে অজুর গুরুত্ব
কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে তাদেরও ভালোবাসেন।”
—সূরা বাকারা (২:২২২)
এই আয়াত প্রমাণ করে যে শারীরিক ও আত্মিক পবিত্রতা আল্লাহর ভালোবাসা লাভের একটি পথ।
আরো বলা হয়েছে—
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন সালাতের জন্য দাঁড়াও, তখন তোমাদের মুখমণ্ডল ও হাত কনুই পর্যন্ত ধুয়ে নাও, মাথা মাসেহ করো এবং টাখনু পর্যন্ত পা ধুয়ে নাও।”
—সূরা মায়েদা (৫:৬)
ইসলামের এই সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রমাণ করে, অজু শুধু ইবাদতের জন্য নয়; বরং পবিত্রতার একটি ধারাবাহিক মান বজায় রাখার নির্দেশনা।
হাদিসের আলোকে অজুর স্থায়ী অভ্যাসের ফজিলত
রাসুলুল্লাহ (সা.) অজুকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। অসংখ্য সহিহ হাদিসে অজুর ফজিলত, পাপ মোচন এবং সবসময় অজুতে থাকার বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে।
১️⃣ পাপ মোচনের মাধ্যম
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—
“যখন একজন মুমিন অজু করে, তখন তার চোখ, হাত, পা দিয়ে যে গুনাহ হয়েছে, অজুর পানির সঙ্গে তা ঝরে যায়।”
—সহিহ মুসলিম
২️⃣ ঘুমানোর সময় অজু অবস্থায় থাকার ফজিলত
রাসুল (সা.) বলেছেন—
“যে ব্যক্তি পবিত্র অবস্থায় (অজু করে) রাত কাটায়, তার সাথে এক ফেরেশতা থাকে। সে ব্যক্তি রাতে জেগে উঠলে ফেরেশতা বলে— ‘হে আল্লাহ! এ বান্দাকে তুমি ক্ষমা করো, কারণ সে পবিত্র অবস্থায় ঘুমিয়েছে।’”
—সহিহ ইবন হিব্বান
৩️⃣ অজু অবস্থায় মৃত্যুবরণ
মহানবী (সা.) বলেন—
“যে ব্যক্তি পবিত্র অবস্থায় (অজু সহ) দিন-রাত কাটাতে থাকে এবং অজুর ওপর অজু গ্রহণ করে, সে মুমিনদের তালিকায় লেখা হয়।”
—তিরমিজি
৪️⃣ অজু রাখা ঈমানের অংশ
রাসুল (সা.) বলেন—
“পবিত্রতা হল ঈমানের অর্ধেক।”
—সহিহ মুসলিম
এই হাদিসগুলো প্রমাণ করে, অজু শুধু ইবাদত নয়; বরং চরিত্র, নৈতিকতা, আচরণ ও ঈমানকে পরিশুদ্ধ রাখার প্রশিক্ষণ।
সবসময় অজু অবস্থায় থাকার বাস্তব ও আধ্যাত্মিক উপকার
১. সর্বদা আল্লাহর স্মরণে থাকা
অজু মানুষকে আল্লাহর উপস্থিতি ও পবিত্রতার কথা স্মরণ করায়। অজু রাখা মানে নিজের জীবনকে আল্লাহর পথে নিয়োজিত রাখা।
২. পাপ থেকে দূরে থাকার প্রেরণা
অজু অবস্থায় মানুষ স্বাভাবিকভাবেই পাপ করতে লজ্জা পায়। মনে থাকে– “আমি এখন পবিত্র অবস্থায় আছি, আল্লাহ আমাকে দেখছেন।”
৩. মানসিক প্রশান্তি ও সতেজতা
বিজ্ঞান বলছে, নিয়মিত পানির স্পর্শ মানুষকে মনস্তাত্ত্বিক চাপ থেকে মুক্তি দেয়। ইসলামের অজু সেই প্রক্রিয়াকে আরও শান্তিময় করে।
৪. স্বাস্থ্যগত উপকারিতা
মুখ, হাত, নাক, পা নিয়মিত ধোয়ার মাধ্যমে জীবাণু কমে, রক্তসঞ্চালন ভালো হয় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।
৫. অতিরিক্ত সওয়াব ও ফেরেশতাদের দোয়া
অজুতে থাকা মানুষের জন্য ফেরেশতারা দোয়া করেন। রাসুল (সা.) বলেছেন যে, অজু করার পর দুই রাকাত নামাজ পড়লে পূর্বের ছোট গুনাহসমূহ মাফ হয়ে যায়।
আচার–আচরণে শুদ্ধতার প্রতিচ্ছবি
অজু অবস্থায় থাকা মানুষ—
- কথা বলায় সংযমী হন
- মনকে খারাপ চিন্তা থেকে বিরত রাখেন
- দেহ–মন উভয়ই পরিচ্ছন্ন রাখেন
- ইবাদত সহজ হয়ে যায়
- আকস্মিক মৃত্যু হলেও পবিত্র অবস্থায় মৃত্যুবরণ করার সম্ভাবনা থাকে— যা বিশাল সৌভাগ্য
সবসময় অজু অবস্থায় থাকা—একজন মুসলমানের জীবনে সাফল্যের পথ
অজুকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা এই শুচিতা ও পবিত্রতা একজন মুসলমানের জীবনমান, নৈতিকতা, মানবিকতা ও আধ্যাত্মিকতা সবকিছুকেই প্রভাবিত করে। দৈনন্দিন অভ্যাসে যদি একজন মানুষ অজু রাখেন—
তাঁর জীবনে:
- আল্লাহর ভালোবাসা,
- বারাকাহ,
- মন শান্তি,
- গুনাহ দূর হওয়া
সবকিছুই একে একে বর্ষিত হয়।

