এইসময় ডেস্ক:
গণতন্ত্রে গণমাধ্যমকে বলা হয় “চতুর্থ স্তম্ভ”। একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মুক্ত গণমাধ্যম ও সংবাদপত্রের অবাধ স্বাধীনতা অপরিহার্য। কারণ, গণমাধ্যমই রাষ্ট্রক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করে এবং জনগণের কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে। তাই ইতিহাস বলছে, যখনই কোনো স্বৈরাচারী বা অবৈধ শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তখনই প্রথম আঘাত এসেছে গণমাধ্যমের ওপর—সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করে জনগণের অধিকার হরণ করা হয়েছে।
কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব এই বাস্তবতায় এক নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। এখন তথ্যপ্রবাহ আর কেবল মূলধারার গণমাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল নয়; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হয়ে উঠেছে তথ্য আদান-প্রদানের অন্যতম প্রধান প্ল্যাটফর্ম। বিশেষ করে যেসব দেশে গণতন্ত্র দুর্বল এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সীমিত, সেখানে সোশ্যাল মিডিয়াই জনগণের প্রধান তথ্যের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরব বসন্ত থেকে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহেও এর প্রভাব অনস্বীকার্য। কিন্তু এই সম্ভাবনার পাশাপাশি তৈরি হয়েছে ভয়াবহ এক সংকট।
সমস্যা হলো—সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত তথ্যের কতটা সত্য, আর কতটা অপপ্রচার? বাস্তবতা হচ্ছে, এখন সত্যের চেয়ে মিথ্যা, তথ্যের চেয়ে গুজব এবং যুক্তির চেয়ে উত্তেজনাই বেশি ভাইরাল হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বড় একটি অংশ আজ “ভিউ” ও “ভাইরাল” ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। যাচাইবাছাই ছাড়া চটকদার ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ছড়িয়ে দিয়ে অনেকেই অর্থ উপার্জন করছে। ফলে সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে হিংসা, বিদ্বেষ ও বিভাজন।
আজকের বাস্তবতায় সোশ্যাল মিডিয়া একদিকে যেমন তথ্যপ্রবাহের স্বাধীনতা দিয়েছে, অন্যদিকে এটি হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক সহিংসতার ভার্চুয়াল মঞ্চ। ভিন্নমত প্রকাশ করলেই কাউকে “দালাল”, “দেশদ্রোহী” বা “গুপ্তচর” বলে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস, চরিত্রহনন, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য—সবই এখন নিত্যদিনের ঘটনা। বিশেষ করে নারী রাজনীতিকদের প্রতি যে ভাষা ব্যবহার করা হয়, তা সভ্য সমাজে অকল্পনীয়।
ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স (সাবেক টুইটার)—সব জায়গাতেই যুক্তির জায়গা দখল করে নিচ্ছে গালাগালি। রাজনৈতিক মতবিনিময়ের জায়গা হয়ে উঠছে অপসংস্কৃতির কেন্দ্র। দলনিরপেক্ষ মত প্রকাশ করলেই প্রশ্ন ওঠে—“আপনি কোন দলে?” ভিন্নমত মানেই শত্রুতা—এমন এক অসহিষ্ণু সংস্কৃতি সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত হচ্ছে।
এখানেই শেষ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ভুয়া অ্যাকাউন্ট তৈরি করে সংগঠিতভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এই ‘ডিজিটাল বাহিনী’ মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে জনমত প্রভাবিত করছে এবং সত্যকে আড়াল করছে।
মিথ্যা তথ্য বা ‘ডিসইনফরমেশন’ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সবচেয়ে বড় হুমকি। এটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেক সময় সরাসরি সহিংসতায় রূপ নেয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গুজবের কারণে নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। বাংলাদেশেও ফেসবুকভিত্তিক গুজবের জেরে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে—যা আমাদের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
একই সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, ব্ল্যাকমেলিং ও ‘হানি ট্র্যাপ’-এর মতো অপরাধও বেড়ে গেছে। ভুয়া প্রোফাইল, বিকৃত ছবি বা মিথ্যা তথ্য ব্যবহার করে ব্যক্তিকে ফাঁদে ফেলে অর্থ আদায় কিংবা সামাজিকভাবে হেয় করার ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। এমনকি বিচারব্যবস্থার বাইরে গিয়ে কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সামাজিক মাধ্যমে “বিচার” করার প্রবণতা তৈরি করেছে—যা আইনের শাসনের জন্য বড় হুমকি।
এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে কেবল তথ্যপ্রবাহই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না; বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সামাজিক সম্প্রীতি এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিপন্ন হবে। সবচেয়ে বড় কথা, হুমকির মুখে পড়বে আমাদের গণতন্ত্র।
তাই এখনই সময় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার।
প্রথমত, নাগরিকদের মধ্যে ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে তারা সত্য-মিথ্যা যাচাই করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে তাদের অ্যালগরিদমে স্বচ্ছতা আনতে হবে এবং ভুয়া তথ্য দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যম, ধর্মীয় নেতা ও সুশীল সমাজকে অনলাইনে সহনশীলতা ও সত্যনিষ্ঠার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
চতুর্থত, সরকারকে এমন নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখে ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।
গণতন্ত্র কোনো সহজলভ্য অর্জন নয়; এটি বহু ত্যাগ ও সংগ্রামের ফল। দায়িত্বহীনতা, অপপ্রচার ও ভিউ-নির্ভর সংস্কৃতির কাছে এই অর্জনকে হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না।
সোশ্যাল মিডিয়ার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে এর নৈরাজ্য রোধ করতেই হবে—এখনই, দৃঢ়ভাবে।